মানব দেহের ভিতর অগ্নাশয় নামে একটি অঙ্গ আছে। যার কাজ শরীরে ইনসুলিন হরমোন তৈরি করা। এই হরমোন আমাদের শরীরের যে খাবার গ্রহণ করি, তা হজম করতে সহায়তা করে । এই হরমোন উৎপাদন কমে গেলে, এই রোগকে ডায়েবেটিক রোগ বলা হয়।

তিতা এবং টক খাবার খেলে কি ডায়েবেটিক কমে?

না ,এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা । তিতা বা টক খাবার খেলে ডায়াবেটিস কমে না।

সাধারণত, বয়স বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য বেশি হওয়ার কারণে এই রোগ দেখা দেয়।

এছাড়াও বংশগতভাবে এ রোগ হয়ে থাকে।

এই রোগ ধীরে ধীরে শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কে দুর্বল করে তোলে। কিডনি, লিভা্‌ ফুসফুস সকল কিছুর কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

ডায়বেটিক্স বেশি অথবা একদম কম হলে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

  • স্বাভাবিকঃ  ১ থেকে ১০
  • ডায়বেটিক্সঃ ১১ থেকে ১০০

যদি ২০ এর উপরে যায় তাহলে জীবন ঝুকিতে পরতে পারে ।

প্রচুর পরিমাণে কায়িক পরিশ্রম করা অথবা ইনসুলিন গ্রহণ করার মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

তবে, ডায়াবেটিকস নিরাময়যোগ্য রোগ নয়। অর্থাৎ ডায়াবেটিকস সম্পূর্ণ ভালো হওয়া সম্ভব নয়।

তিতা খাবার খেলে কেন ডায়াবেটিকস কমে না?

যারা ডায়াবেটিস রোগে ভুগছেন তাদেরকে অনেক সময় বিভিন্ন মানুষ পরামর্শ দিয়ে থাকেন সজিনা পাতা, করলা ইত্যাদি তিতা জাতীয় খাবার বেশি বেশি খাওয়ার জন্য। চিনি খেলে ডায়াবেটিস বৃদ্ধি পায় তাই তাদের ধারণা তাহলে তিতা খাবার খেলে ডায়াবেটিস কমবে।

প্রথমে আপনাকে ডায়াবেটিকসের ফাংশনস বুঝতে হবে।

আমাদের শরীরে যে ইনসুলিন তৈরি হয় , তা আমরা যে খাবার খাই সেই খাবারকে ভাঙ্গতে সহায়তা করে। যদি খাবারে গ্লুকোজ বা চিনির পরিমাণ বেশি থাকে তাহলে এই ইনসুলিন বেশি লাগে। শরীরে ইনসুলিন তৈরি করার ক্ষমতা কমে গেলে তখন চিনি জাতীয় খাবার খেলে ওই পরিমাণ ইনসুলেন্স চিনিজাতীয় খাবার কে ভাঙতে পারে না। তখন শরীরে গ্লুকোজের  মাত্রা বেড়ে যায়।  গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধিকেই ডায়েবেটিক বলে। এজন্য চিনি জাতীয় খাবার খাওয়া যাবেনা।

ডায়াবেটিকস মাত্রা কমার সাথে তিতা বা টক জাতীয় খাবার এর কোন সম্পর্ক নেই। আপনি যে খাবার খান না কেন তা ভাঙতে এই ইনসুলিন প্রয়োজন।

ডায়াবেটিকস কত প্রকার ও কি কি?

বৈজ্ঞানিকদের মতে ডায়াবেটিস কে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১. টাইপ -1 ডায়াবেটিস
২. টাইপ -2 ডায়াবেটিস

টাইপ -১ ডায়াবেটিস কাকে বলে?

টাইপ 1 ডায়াবেটিস শিশু অথবা তরুণদের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। শরীরের যে অগ্নাশয় থেকে ইনসুলিন তৈরি হয় সেই অগ্ন্যাশয় এর পোষ্ট গুলো যদি ধ্বংস হয়ে যায় এর ফলে ইনসুলিন উৎপন্ন বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রকার ডায়াবেটিস টাইপ 1 ডায়াবেটিস বলা হয়।

  • জিনগত কারণে টাইপ-১ ডায়াবেটিকস দেখা দেয়।
  • 10 থেকে 30 বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের টাইপ 1 ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
  • যদি পরিবারের কারো ডায়াবেটিস থেকে থাকে তাহলে এর সম্ভাবনা 70 থেকে 80 ভাগ।

টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস কে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে

  1. টাইপ-১ এ
  2. টাইপ-১ বি

টাইপ-১ এ

ইনসুলিন উৎপন্নকারী অগ্ন্যাশয় এর কোষ মরে গেলে যে ডায়াবেটিস হয় তাকে টাইপ-১ এ ডায়াবেটিস বলা হয়।

টাইপ-১ বি

বিজ্ঞানীরা এখনো টাইপ-১- বি কি কারনে হয় তা আবিষ্কার করতে পারেনি।

টাইপ 1 ডায়াবেটিস হওয়ার কারণ

ডায়াবেটিস আক্রান্তদের 30 থেকে 40 শতাংশ রোগী টাইপ 1 ডায়াবেটিস এর অন্তর্ভুক্ত। এরমধ্যে 20 থেকে 30 বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরা 70 থেকে 80 শতাংশ। এবং 20 থেকে 30 শতাংশ কিশোররা। যাদের বয়স 1 থেকে 15 বছর।

টাইপ 1 ডায়াবেটিস প্রধানত জেনেটিক কারণে হয়ে থাকে। দাদা-দাদী মা-বাবা নানা-নানী যে কারো ডায়াবেটিস থাকলে সেই বাচ্চা ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
অগ্নাশয় বিটা কোষ ইনসুলিন তৈরি করে থাকে, এই বিটা কোষ নষ্ট হয়ে গেলে টাইপ 1 ডায়াবেটিস হয়। বিটা কোষ মৃত আবার অনেক কারণ রয়েছে। এটি বংশগতভাবে মৃত্যু হতে পারে অথবা আপনার খাদ্যাভ্যাস অথবা জীবন-যাপনের উপর প্রভাব পড়ে এই কোষ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

টাইপ 1 ডায়াবেটিস এর লক্ষন

  • ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ।
  • পানি পিপাসা বেড়ে যাওয়া
  • প্রচুর ক্ষুধা লাগা
  • মিষ্টি কিম্বা মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাওয়া।
  • চোখে ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?

ডায়াবেটিকস মানে আপনার শরীরের প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া। টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস প্রধানত

  • আপনার হার্ট, কিডনি ,লিভার ইত্যাদি কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
  • হৃদ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা
  • কিডনি এবং লিভার ড্যামেজ
  • শরীরের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয় না
  • চোখে ঝাপসা দেখা। সর্বোচ্চ চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
  • দীর্ঘদিন ইনসুলিন ব্যবহারের ফলে শর্করার পরিমাণ কমে গিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

টাইপ -১ ডাইবেটিক্স কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়?

ডায়াবেটিকস সম্পূর্ণরূপে নিরাময় করার চিকিৎসা এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারেনি। ডায়াবেটিকসে অগ্ন্যাশয় কোষ মৃত হয়ে যায়। এই কোষকে জীবিত করার চিকিৎসা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। তবে এই টাইপের ডায়াবেটিকস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

  • ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন গ্রহণ করা।
  • খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা। ফ্যাট এবং শর্করা জাতীয় খাবার পরিহার করা
  • নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম বা শরীরচর্চা করা।

টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস কি তিতা বা টক জাতীয় খাবার খেয়ে কমানো সম্ভব?

আশা করি , এতটুকু পড়ার পরে এই প্রশ্ন আপনার কাছে অনেক হাসির হবে। কারণ তিতা বা টক জাতীয় খাবার আপনার অগ্নাশয় ইনসুলিন তৈরি করার কোষ কে জীবিত করতে পারবেনা।
তিতা বা টক জাতীয় খাবার খেয়ে টাইপ-১ ডায়াবেটিস অথবা যে কোন প্রকারের ডায়াবেটিকস বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না।

এবার আসি টাইপ টু ডায়াবেটিস

টাইপ -২ ডায়াবেটিকস কাকে বলে?

দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মাত্রায় মিষ্টিজাতীয় খাবার খেলে টাইপ টু ডায়াবেটিস হতে পারে। টাইপ টু ডায়াবেটিস জিনগত কারণে হয় না।

কারণ:

  • দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চিনি বা চিনি জাতীয় খাবার খেলে।
  • খাবারে প্রচুর পরিমাণে চর্বি থাকলে।
  • নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম না করা।
  • শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে যাওয়া।
  • অনেক সময় বংশগত কারণে টাইপ টু ডায়াবেটিস হতে পারে । তবে এটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসের লক্ষণ

  • ঘন ঘন প্রস্রাব
  • পানি পিপাসা
  • ঘন ঘন ক্ষুধা লাগা।
  • মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি প্রচুর আগ্রহ।
  • চোখে ঝাপসা দেখা।
  • শরীরে চুলকানি হতে পারে।
  • মহিলাদের যোনীতে ইনফেকশন হতে পারে।
  • শরীর দুর্বল অনুভব হতে পারে।
  • অল্পতেই খুব ক্লান্ত বোধ হয়।
  • শরীরে চর্মরোগ দেখা দিতে পারে।

অনেকের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো খুবই কম দেখা দেয়। তবে 3 থেকে 4 বছর অতিক্রম হলে উপরের লক্ষণ গুলো বেশি দেখা দেয়।

টাইপ টু ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির কি ধরনের সমস্যা হতে পারে?

  • টাইপ টু ডায়াবেটিস নিরাময় অযোগ্য।
  • হার্ট এবং রক্তনালীর সমস্যা হতে পারে।
  • স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • পায়ে রক্ত সঞ্চালন কমে গিয়ে কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।
  • দৃষ্টিশক্তি কমে যায় এমনকি অন্ধ হয়ে যেতে পারেন।
  • কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে অথবা একদম নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

এছাড়াও যৌন শক্তি কমে যায়, শরীরে চর্মরোগ দেখা দেয়, শরীরে কোথাও কেটে গেলে তা ঠিক হতে অনেক সময় লাগে।

টাইপ টু ডায়াবেটিস কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়?

আগেই বলেছি কোন প্রকার ডায়াবেটিকস সম্পূর্ণভাবে নিরাময় সম্ভব নয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

  • পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হবে।
  • চিনি জাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে।
  • ব্যায়াম এবং শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।
  • প্রচুর পরিমাণে হাঁটাহাঁটি করতে হবে। কমপক্ষে প্রতিদিন 4 থেকে 5 কিলোমিটার হাঁটতে হবে।
  • সরাসরি গ্লুকোজ জাতীয় খাবার খাওয়া যাবেনা।
  • মিষ্টির অভাব পূরণের জন্য ফলমূল খেতে হবে।
  • ভিটামিন ডি জাতীয় খাবার খেতে হবে।
  • নিয়মিত শাকসবজি খেতে হবে।
  • আলু খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে কারণ আলুতে প্রচুর পরিমাণে শর্করা থাকে।

ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করে, সেই অনুসারে চলতে হবে।

অতিরিক্ত কিছু পরামর্শ

অলস শরীরে খুব সহজে ডায়াবেটিকস বাসা বাঁধতে পারে। একবার ডায়াবেটিকস হয়ে গেলে এর হাত থেকে বাঁচার কোন উপায় নেই। তাই অলস ভাবে বসে না থেকে কায়িক পরিশ্রম করুন।

বেশি বেশি করে হাঁটাহাঁটি, খেলাধুলা, বাড়ির বিভিন্ন কাজকর্ম করুন তাহলে শরীর ভালো থাকবে এবং ডায়াবেটিকস ও বিভিন্ন ধরনের রোগ আপনার শরীরে আক্রমণ করতে পারবে না।

নিজের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখুন। সব সময় চিনি জাতীয় খাবার কম খাবেন। ডায়াবেটিকস হলে চিনি আপনার জন্য ক্ষতি এমন নয়। ডায়াবেটিকস না হলেও চিনি আপনার শরীরে অনেক ক্ষতি করে। তাই চিনি থেকে দূরে থাকুন।

আপনার খাদ্যাভ্যাসে ছোলা জাতীয় খাবার যুক্ত করুন। ছোলা জাতীয় খাবার আপনার শরীরে অনেক উপকার করে। কাঁচা ছোলার উপকারিতা।

By Mahedi

লেখালেখি আমার সখ ও পেশা। আমি টেক্সটাইল এর উপর বিএসসি করেছি। কিন্তু পেশা হিসেবে ব্লগিংকে বেছে নিয়েছি। বর্তমানে এটি খুবই সন্মানজনক পেশা। আমি সাধারণত খেলাধুলা, ছবি, পড়াশোনা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লিখতে ভালবাসি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *